Saturday, January 28, 2017

অনুগল্প » আগুন

১।
পোড়া ঘরের বারান্দায় নিহত বেলাল হাসানের মা নুর বানু বিলাপ করতেছিল চিৎকার করে। “ও পুত তুই হন্ডে গেলি। আঁরে ফেলাই ক্যানে গেলিগুই। তোর মাইয়ের কি অইবু। তারে হনে চাইবু” (ও ছেলে, তুই কই গেলি। আমাকে ফেলে কেমন করে চলে গেলি। তোমার মেয়ের কি হবে? তাকে কে দেখবে?) কাঁদতে কাঁদতে এক পর্যায়ে নির্বাক হয়ে পড়ে নুর বানু। ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ একজন দু’বছরের অদিতি কে দাদীর কোলে তুলে দেয়। নাতনীকে দেখে আবার আতর্নাদ করে কেঁদে ওঠেন তিনি। দাদীর আহাজারি শুনে মা-বাবার জন্য কাঁদতে শুরু করে অবুঝ অদিতিও। সান্ত্বনা দিতে আাসা স্বজন ও প্রতিবেশীরাও আর নিজেদের সামলে রাখতে পারে না। সবার চোখে ছল-ছল পানি টলমল করে। কেউ আড়ালে চোখের জল মুছে। কেউবা নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে ভিড় থেকে একটু আড়ালে চলে যায়।


২।
প্রতিবেশীদের আগুন আগুন চিৎকারে ঘুম ভাঙে নাহিদা ও তার স্বামী বেলাল হাসানের। শীতের কুয়াশাময় ভোররাত, ঘড়িতে তখন বাজে সাড়ে তিনটা। দুই বছরের মেয়ে অদিতি কে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন তাঁরা। বাহিরে এসে দেখতে পান, পাশের বাড়িতে দপ দপ আগুন জ্বলছে। আগুনের শিখা ছুয়েছে পাশের বাঁশঝাড়ের তিনতলা উচুঁ সমান বাশেঁর ডগা পযর্ন্ত । চারদিকে হইহুল্লোড়, চিৎকার-চেচামেচির শব্দ। মেয়েকে একজনের কাছে রেখে স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই আগুন নেভানোর কাজে নেমে পড়ে। এর মধ্যে আগুন ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়ে তাঁদের একতলা বাড়ির সামনের অংশেও। বেশ কিছুক্ষন পর আগুন নিয়ন্ত্রনে এসেছে মনে করে গুরুত্বর্পূন কাগজ, দলিল ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদগুলো বের করে নিয়ে আসতে নিজ ঘরে ঢোকে নাহিদা। অনেক সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও স্ত্রী বের হচ্ছে না দেখে ঘরে দ্রুত ছুটে যান স্বামী বেলাল হাসান। শেষ পযর্ন্ত দু’জনের কেউ আর ঘর থেকে জীবিত বের হয়ে আসতে পারেনি।


৩।
আগুনে ছয়টি কাঁচা-পাকা বসতঘর ও একটি একতলা ঘরের একাংশ পুড়ে গেছে। রান্নাঘরের চুলা থেকে এই আগুন ছড়িয়েছে বলে ধারনা ফায়ার সার্ভিসের। পুড়ে যাওয়া একতলা ঘরের ঐ কক্ষটিতে পরিবার নিয়ে থাকতো বেলাল হাসান। আগুনে ঘরের দরজা পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘরের দরজা জানালা ও বাহিরের দেয়াল। ভেতরের দেয়াল ধোঁয়ায় কালো হয়ে গেছে। কতর্ব্যরত চিকিৎসকেরা তাঁদের শরীরের কোথাও কোন পোড়ার চিহ্ন পায়নি। কালো ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে মারা গেছে তারা দু’জন। আগুনলাগার পরের দিন ছিল মেয়ের জন্মদিন। আত্মীয়-স্বজনদেরকে দাওয়াতও করেছিল তাঁরা জন্মদিনের অনুষ্ঠান উপলক্ষে । আগুনের তাণ্ডবে সব কিছু মিশে গেল মাটির সাথে মর্হুতেই।


বৃহস্প্রতিবার, জানুয়ারী 26, 2017


□ অনুগল্প » অপমৃত্যু


এক.
মেয়েদের দিকে  ড্যাব ড্যাব চোখে তাকিয়ে থাকে। বিভিন্ন  ছুতায় স্পর্শকাতর জায়গায় হাত লাগানোর চেষ্টা করে।  বিশেষ ইঙ্গিতপূর্ণ দুষ্ট দুষ্ট কথা বলে। যা শুনার পর মেয়েরা প্রায় বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। জসিম ছেলেদের সাথে রুক্ষ ব্যবহার করলেও মেয়েদের ক্ষেত্রে তার নরম ব্যবহার দেখা যায়। স্কুলের বড় ক্লাসের বড় আপুরা বলে ঐ বেটার চোখ খারাপ। তানি কিছুটা হলেও বুঝতে সক্ষম হয় কেননা তাকেও নিয়মিত লাইব্রেরীতে যেতে  হয় নোট করার জন্য। গন্থাগারিকের ব্যবহার মধুময় হলেও দৃষ্টিভঙ্গি তার কাছে অশোভনীয় বলে মনে হয়।

দুই.
বাবা-মার আদরের মেয়ে তানি। ছোট থেকে মেয়েটা খুব চঞ্চল আর দুরন্তপনা । যার ফলে খুব সহজে মানুষের  নজরে চলে আসে। শারিরীক দিক দিয়ে দেখতে খুব হৃষ্টপুষ্ট ও সাবলীল। দেখে মনে হবে না সেই ৭ম শ্রেনীর ছাত্রী। প্রথম দেখাতেই সবাই মনে করে সেই ৯ম কিংবা ১০ম শ্রেনীতে পড়ে। ছোট বেলা থেকে পড়াশুনায় দারুন মেধাবী  বলে মা-বাবার মতো পাড়া-প্রতিবেশী ও স্কুলের সব স্যার তানিকে নিয়ে খুব আশাবাদী। সুচিকিৎসার অভাবে তার ছোট খালা প্রসব বেদনার সময় মারা গিয়েছিল। সেই থেকে তার বাবা-মায়ের স্বপ্ন পড়াশুনা শেষ করে মেয়ে একদিন বড় ডাক্তার হবে। পরিবার পরিজনের মুখ উজ্জ্বল করবে। গ্রামের অসহায় দুস্থ মানুষের চিকিৎসা সেবায় তার মেয়ে এগিয়ে আসবে।

তিন.
সূর্য ডুবু ডুবু সন্ধ্যার আবেশ ছড়িয়ে পড়ছে প্রকৃতির মাঝে। নিরব নিস্তব্ধতায় ছুঁযে গেছে চারপাশ। গ্রামের একটি ধর্মীয় সভায় গিয়েছিল তারা। সভা প্রায় শেষ হতে চলেছে। মা তানিকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল সভা শেষ হওয়ার খানিকটা সময় পূর্বে ঘরে সন্ধ্যা বাতি জ্বালানোর জন্য। বাড়ি থেকে সভারস্থলের  দুরত্ব বেশি নয়।  খাল পাড়ের বাশঁঝাড়টা পার হলেই তাদের বাড়ি দেখা যায়। যাওয়ার পথে দেখা হয় স্কুলের লুচ্ছা খ্যাত গ্রন্থাগারিক জসিমের  সাথে। একা পেয়ে লোলুপ দৃষ্টি পড়ে তানির উপর। পৌঁছে দেওয়ার নাম করে তানির সাথে ভাব জমিয়ে যায়  বাড়ি পর্যন্ত । পরিবেশ বুঝে শিকারী বাঘের  মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে ফাঁকা বাসায়। অল্প সময়ে ক্ষত-বিক্ষত হয় ফুলের পাঁপড়ির মতো তানির কোমল শরীর।  বিছানায় অজ্ঞান হয়ে নুয়ে পড়ে তানির নিথর দেহ ফুলদানিতে রাখা বাসী ফুলের মতো।

চার.
ঘটনাটি জানাজানি হয়ে যায় পুরো গ্রামে। চলে আসে সোস্যাল মিডিয়ার টাইমলাইনে ও দৈনিক প্রত্রিকার পাতায়। অপমান-লজ্জায় স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। লোকলজ্জার ভয়ে মা-বাবা পাঠিয়ে দেয় নানার বাড়িতে। কারো সামনে যেতে পারে না চক্ষু লজ্জায়। ডাক্তারি পরীক্ষায় ধর্ষনের আলামত পাওয়া যায়। কারাগারে আটক লম্পট জসিমকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে স্কুল কৃর্তপক্ষ। কারণে-অকারণে মানুষও মুখরোচক কথা বলে বেড়ায় চারপাশে। সুস্থ হওয়ার পর মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে চঞ্চল মেয়েটি। মানসিক যন্ত্রনায় বেঁচে থাকার উৎসাহ হারিয়ে পেলে ধীরে ধীরে। দুর্ষহ স্মৃতি বার বার চোখের মনিকোঠায় ভেসে উঠে তার। এমন দুর্বিসহ যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য নানার বাড়িতে সবার অজ্ঞাতসারে  কীটনাশক পান করে আত্মহত্যা করে তানি। লাশের ময়নাতদন্ত শেষে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থানায় অপমৃত্যু নামে একটা মামলা নথিভুক্ত করেছে।


জানুয়ারী 4, 2017 গল্প, স্লাইড